Bangla Poets and Their Creation ।। বাঙলা কবি ও কবিতা
হামিদ রায়হান
বাঙলা কবিতার বয়েস অনুমাননির্ভর। এর বয়েস কত, এর শৈশবেব দিকে দৃষ্টি দিলে উপলব্ধি করা যায়। নেপালের রাজ দরবার থেকে এর যে রাজকিয় উত্থান, কালের গহিন অন্ধকারে হারিয়ে যেতে যেতে কিছু অনুসন্ধিসুৎ মানুষের কারণে ধ্বংসের অতলে উটপাখির মতো বালুচরে মুখ লুকোনোর আগে তা সভ্যতার পাদপিঠে এর প্রোজ্জ্বল পদচিহ্ণ, এবং বহু পরিশ্রমি ও মেধাবি সৃজনশীল মানুষের ত্যাগ ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এতদূর অব্দি আসা। আজকে যে বাঙলা কবিতার পরিশীলিত রূপ লক্ষ্য করা যায়, অতীতের অজস্র মানুষের ত্যাগের ফল তা কারও বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ এর প্রবহমানতার প্রতিটি স্পন্দনের সঙ্গে পরিচিত ও জ্ঞাত। বহু উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে এর পথ চলা তা অনুমেয়। প্রাচিন ও মধ্যযুগ পেরিয়ে বাঙলা কবিতার আধুনিকতা শুরু হয় তা অবশ্য মধুসূদন দত্তের দ্বারা। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে ত্রিশের পঞ্চম পাণ্ডবের স্থিতি পায় বাঙলা কবিতার আধুনিকতা। কারও কারও ভিন্ন মত পোষণ করলেও তা উচকিত ও বায়বিয়। এখনও বাঙলা কবিতা এঁদের তৈরি চেতনাকাঠামো ও রূপবলয় থেকে পরবর্তী সময়ের কবিরা কতটা নিজেদের সীমা কিংবা নিজেদের কণ্ঠকে বিশিষ্ট করে তুলতে পেরেছেন। তবে যে ক’জন কবি, ওঁদের থেকে সরে আসতে পেরেছেন, অন্যভাবে বলা যায়, ওঁরা হলেন: বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্রোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
কবিতা নিয়ে অনেক কথা, আর আবর্য রজনির গল্প বলা সমান কথা। কথা সবাই বলে তাই বলে কথক নয়। তেমনি কবিতা লেখা মানেই সবাই কবি নয়। জীবনানন্দ এ রকমই বলে গেছেন। এটিই যে একমাত্র ধর্তব্য, সেই স্থির বিন্দুতে কোন পাঠক কিংবা কোন প্রতিভাবান কবি থিতু হবেন না, তা চোখ বুঝে বলা যায়।
বাঙলা কবিতা কাল পরিক্রমায় এর রূপ, আঙ্গিক, কিংবা চেতনাকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন দেখা গেছে, তা কোন অর্থে নিচু চোখে দেখা যাবে না। এ যেমন একটি শিল্পমূল্য দাবি করে, তেমনি সমাজতত্ত্বের বিচারে, ধর্মিয় দিক থেকে, নৃতাত্ত্বিক দিকে থেকে, কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিকায় এর উপাত্তগুলো বিবেচনা করলে এর প্রকৃত রূপ অবগুণ্ঠিত হবে, তা কোন অর্থে উড়িয়ে দেয়া যাবে না।
চর্যাপদ থেকে বাঙলা কবিতার সূচনা কাল পরিক্রমায় এর হাঁটা, এখনও হাঁটছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে, তা কোনভাবে হালকা চোখে দেখা যাবে না। আজকের যে বাঙলা কবিতার রূপটি দেখা মেলে তা একদিনের ফসল নয়, তা প্রাচিন নগরির মতো বীর্যময়, ঋদ্ধ ও বর্ণিল। তাই বাঙলা কবিতা যে হাজার বছরের ইতিহাস ধারণ করে আছে, সম্মিলিত সৃষ্টিশীল মানুষের অবদান, একক কোন প্রচেষ্টার ফসল নয়, তা এখন কারও বুঝিয়ে বলা দরকার আছে বলে মনে হয় না। এ কাল অব্দি চর্যাই বাঙলা কবিতার আদি রূপ, তাতে কারও সন্দেহ নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে এর হের ফের হবে না, তারও কি কেউ উচকিত গলায় বলতে পারে? হয়তবা কিংবা হয়তবা না।
মূলত বাঙলা কবিতার প্রকৃত আধুনিকতার রূপটি মধুসূদন দত্তের সর্বপ্রথম দেখা যায়। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সফল রূপকার, এটা বলা যায়।
জীবিতাবস্থায় জীবনানন্দ কী মত যাপন করে গেছেন, তা কমি বেশি সাহিত্যের বাইরের হাতে গোনা কিছু মানুষ অবশ্য জানেন। লেখার সঙ্গে যারা কম-বেশি জড়িত আছেন, তাদের অধিকাংশ জানেন। তবে কবির সৃজনের সঙ্গে কবিতা লেখেন এর ক’জন জানেন তা হয়ত হাতের আঙ্ঙুলে কষে বলা যাবে। এ কথা কাজী নজরুলের ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য তা পাঠক মাত্র বলতে পারবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙলা কবিতায় কতটা, তা এক কথায় বলা কতটা সম্ভব, কারও পক্ষে হলফ করে যাবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরোত্তর কবিতায় জীবনানন্দ দাশ একটি বিশাল স্থান জুড়ে আছেন, চোখ বুজে বরা যায়। এখনও তার আধিপত্য চলছে, তাও চড়া কণ্ঠে বলা যায়। এ যেন একটা নীবর বিপ্লব।
কাল বড় নির্মম। সমকাল কখনও একজন কবিকে বিচার করতে পারে না। তবে শণাক্ত করতে পারে না, তাও সবক্ষেত্রে সত্য নয়। এর ব্যতিক্রম যে হয় না, তা প্রকাশ্যে বলা যায় না।
সুধীন্দ্রনাথ পড়তে কেবল চিত্তবৃত্তির কাছে নিজেকে সঁপে দিলে চলে না, এ কবির কবিতাকে বুঝতে কিছুটা পাঠেরও প্রয়োজন। এর ফলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ কবির কবিতা অধিকাংশ পাঠকের চোখের আড়ালে থেকে যায়। জীবনানন্দ যেমন যাপনের আটপৌরে আমেজগুলো, উপলব্ধিগুলো কিংবা অবচেতনার টুকরো টুকরো খণ্ড চেতনাকে একটি সামগ্রিকতায় তুলে এনেছেন মধ্যবিত্ত ও নৈর্ব্যক্তিক চেতনাকাঠামোয় তা সত্যি অসাধারণ।
সমর সেনের কবিতা একটি মানষিকতার একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, তা কারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখার দরকার আছে কিনা বলা কঠিন।
শামসুর রাহমানও জীবনানন্দ দাশের পথে হাঁটলেও তাঁর একটি পরিমণ্ডল নির্মাণ পাঠকরা দেখেন। তবে, সেটা নাগরিক। এ ক্ষেত্রে, ফররুখ আহমদের কবিতাও একটি বিবেচনা দাবি রাখে। একটি ভিন্ন পরিবেশের আমেজ পাঠকরা তাঁর কবিতায় পায়। এ সময়ে আরেকজন কবির কথা বলা খূবই জরুরি। এ কারণ, ছড়ার লৌকিক ভঙির সঙ্গে ঘরোয়া আমেজের যে পদচারণা দেখা যায়, তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি হলেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তাঁর “সাতনরী হার”, “আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি” এর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ কথা না বললে নয়, জসীমউদ্দীনের কবিতা বাঙলা কবিতায় যে বিপ্লব কাব্যজগতে তা কোনমতে পেছনে ফেলে রাখা যাবে। যে-ই জসীমউদ্দীনের অবদানকে আড়ালে রাখতে চেষ্টা করুক না কেন তা সময়ের ও মেধার অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। যে ঢঙ, কাব্যভঙি ও শৈলির সঙ্গে কাহিনি কাব্যের সূচনা তাঁর হাত দিয়ে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয় তা সত্যিই অসাধারণ, অপূর্ব। তাঁর “সোজনবাদিয়ার ঘাট” (১৯৩৪) ও নক্সীকাঁথার মাঠ সহ বহু কবিতা গ্রামিণ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের যে চিত্রায়ণ পাঠক করে এর প্রতিধ্বনি, যেমন- জসীমউদ্দীনের “সেজানবাদিয়ার ঘাট” আবু জাফর ওবায়দুল্লাহের “সাতনরী হার” কাব্যগ্রন্থে লক্ষ্য করা যায়। তবে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বিভিন্নতা ও আলাদা স্বরকে অবশ্য শণাক্ত করা যায়।
চল্লিশের কবি আহসান হাবীবের কবিতাও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এর কারণ, তাঁর কবিতায় পাঠকরা গ্রামিণতার সঙ্গে নাগরিকজীবনের একটি সেতুবন্ধণ লক্ষ্য করে। অনেকে অবশ্য আল মাহমুদের কবিতায় যে গ্রামিণ উপাত্তর সংশ্লেষণ তা আহসান হাবীরের কবিতার পরাম্পরা বলে স্বীকার করেন।
সৈয়দ শামসুল হকের কবিতাও এক্ষেত্রে আঙুল তোলে আমাদের দিকে। এটা পাঠকের নজর এড়ায় না। এর সঙ্গে আবুল হাসানের কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এর কারণ, তাঁর কবিতার বিষয় ও প্রকরণ।
তবে এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি না বললে নয় পঞ্চাশ দশক থেকে আজকের সময় অবধি বহু কবির কবিতায় বুদ্ধদেব বসুর
কাব্যভঙি ও চেতনার অনুরণন অগ্রজ ও অনুজ কবিদের মধ্যে প্রবলভাবে প্রোজ্জ্বল ও শণাক্তযোগ্য।
হাতে কলমে তাদের কবিতা উল্লেখ করা যায়।
নাম ও কবিতা উল্লেখ করার সমূহ বিপদ প্রতিটি স্টেপে উপস্থিত। এর কারণ, যেখানে একজন কবি অন্য আরেকজন কবির নাম বলতে গিয়ে একই নামের অন্য একজন লেখকের স্লিপ অব মাউথ হওয়ায় শারীরিকভাবে নাজেহাল হতে হয়েছে। তাই সমকালের কবিদের নাম কিংবা কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে যাওয়া মানে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা। তাই বলে কি সত্য বলা হবে না?
যাই হোক, বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় যে জৈবিক প্রেষণা ও অবদমনের স্বর ও হাহাকার লক্ষ্য করা যায়, তা বুদ্ধদেব বসুর পরের প্রজন্মের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কবিতায় সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। নব্বই দশকের অনেক কবির মধ্যে এ প্রবণতা সাবলীলভাবে উপস্থিত। নব্বইয়ের আগের দশকগুলোর বহু কবিদের কবিতায় সেই প্রবণতা ও চেতনার সংশ্লেষ লক্ষযোগ্য। রুদ্র মুহম্দদ শহিদুল্লাহ কিছু কবিতায় তা দেখা যায়।
তবে, রুদ্র মুহম্দদ শহিদুল্লাহ’র কবিতায় রাজনৈতিক ও প্রেমের একটি অপূর্ব রসায়ণ পাঠককে টানে। একই ভাবে হেলাল হাফিজের কবিতার ক্ষেত্রে এ কথা বলা যায়। এটা সত্য যে, তার কবিতা রাজনৈতিক প্রণোদনা উপস্থিতি উজ্জ্বলভাবে পাঠককে প্রাণিত করলেও এর আন্তঃস্রোত প্রেমের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট।
এর সমান্তরালে নির্মলেন্দু গুণের নাম উল্লেখ করা যায়। তার “প্রেমাংশুর রক্ত চাই” থেকে বহু কাব্যে সেই সব উপাদান চমৎকারভাবে একীভূত ও কাব্যগুণ অতিক্রম করেছে। তবে এ না বললে নয় তার অনেক কবিতা সমকালিনতায় সরল রেখায় প্রবাহিত, যা সময়ের দাবিকে পুরণ করতে গিয়ে সাতপাঁকের অাঁচলের কাছে বাঁধা পড়েছে। বরং সমকালিন যাপনের সমস্ত সম্পকগুলোকে তাঁর কবিতা অন্তর্ভূক্ত করে, এ কারণে নয় যে সিবসময় শিল্পের সব শর্তকে পূরণ করেছে, যাপনের চারদিকে ঘটমান প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর একটি সাঁকো তৈরি হয়, এর ফলে সব সময় শিল্পের শর্তগুলো খুঁজতে যাওয়া ঠিক নয়। উল্টোদিকে, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে ঘটমান প্রবহমানতার দিকে তাঁর কবিতার যে উশখুশ তা সত্যি পাঠক মাত্র বিমোহিত করে, করে উজ্জ্বীবিত।
সিকদার আমিনুল হকের কবিতা যদি এক্ষেত্রে বিবেচনা করি, তাহলে যে অনুষঙ্গগুলো আঙুল তোলে তা হল সমকালিনতার বৃহৎ পাঠাতনের উপর শিল্পশর্তগুলো, যা দৈনন্দিন যাপনের ছাপচিত্র, বলা যায়।তবে কখনও কথনও তাঁর কবিতায় সমকালিতার উপরিস্তরগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতে দেখা যায়, যা তাঁর সময়ের আরেকজন কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতায় বিদ্যমান।
আবদুল মান্নান সৈয়দ এর কবিতায় যে অনুষঙ্গগুলো একীভূত, যা পাঠকমাত্র অনুরণিত ও শিহরিত হলেও তা কোনভাবে বড় ক্যানভাসে কোন ছবির মতো আমাদের পাঠকের সামনে উপস্থিত হয় না; তবে, এ কথা সত্য, বড় ক্যানভাসে তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে সমুজ্জ্বল না-হলও একটি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে পাঠককে উজ্জীবিত করে। প্রথম দিকের তাঁর কবিতা যে সম্ভবনা নিয়ে পাঠকের কাছে প্রকাশিত হয়, যা পরে মিয়্রমাণ, অনুজ্জ্বল।
(অপরিশোধিত, অসমাপ্ত, চলবে)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন