আল মাহমুদ বাঙলা কবিতায় কতটা প্রাসঙ্গিক, এর চেয়ে বরং বর্তমানে তাঁর অর্জন ও সম্ভাব্যতা নিয়ে নিঃসকোচে কথা বলা যায়। একে লগ্ন করে তাঁর কবিতা বনাম তাঁর দশক, কিংবা এর পরের সময়, অথবা বাঙলা কবিতার সাপেক্ষে তাঁর কবিতা কতটা সমান্তরালভাবে এগিয়ে গেল কিংবা সবকিছুকে ছাপিয়ে তাঁর কবিতা বাঙলা কবিতার সংস্কৃতি ও এর পরম্পরাকে কতটা সম্ভাব্যতায় তুলে ধরল, তা তলিয়ে দেখা যেতে পারে।
অন্যভাবে বলা যায়, সামগ্রিকভাবে আল মাহমুদ এর কবিতা বাঙলা কবিতায় কতটা আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিঃসঙ্কোচে কথা বলা যায়্।
অাল মাহমুদ তাঁর সময়ের একটি বিশিষ্ট ও ভিন্ন স্বর, যা তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যান্য কবিদের থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করেছে। তাতে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়।
বাঙলা কবিতা কতদূর এগোল, তা অন্ধকে হাতি দর্শনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, কেউ কেউ যখন অতি সাধারণ জিনিসকে অতি কণ্ঠে বলেন, কাছে কিংবা হালের কোন যে আলোচনার দিকে নজর দিলে শরীরের লোম মুহূর্ত দাঁড়িয়ে যায়। সমকালিন অতি তুচ্ছ মানের লেখাকে যেমন অতি মহান করে তোলেন, যেমন- নব্বই দশকের অধিকাংশ লিটল ম্যাগের প্রবন্ধগুলো কিংবা লেখাগুলোর দিকে চোখ দিলে এটা কারও আর বুঝিয়ে বলতে হয় না। কেউ কেউ সম্পাদক বলে, কিংবা অন্য কোন কারণে হোক, তা নির্লজ্জের মতো এসব করে থাকেন। লেখাগুলোর কথা না হয় না বললাম। একজন প্রকৃত কবি বা লেখক এসব সমকালিন প্রণোদনার দিকে দৃষ্টি দেন, দেন লেখার দিকে।
আল মাহমুদ বাঙলা কবিতায় কতটুক স্থান করে নিল তা সাহিত্যের অন্যতম বিষয় কিনা তা অবশ্যই আলোচনার বিষয়। তবে এখান, মানে বাংলাদেশে যে সিন্ডিকেট সাহিত্য বলয় গড়ে উঠছে তাতে একজন প্রকৃত কবির কতটা সৎভাবে মূল্যায়ন হবে তা যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
এর কারণগুলো, যেমন-
ক. যারা কবি ও কবিতা নিয়ে আলোচনা করেন, তাদের অধিকাংশ ডিগ্রি অর্জন কিংবা পদ লাভের লক্ষ্যে প্রবন্ধ
লিখে থাকেন। এর ফলে, তাদের লেখা একপেশে ও একরৈখিক হয়ে দাঁড়ায়।
খ. টীক্কা ও টিপ্পনি ছাড়া তারা অন্য কিছু ভাবতে পারেন না। একই ছকের ভেতরে কেবল ঘুরপাক খেতে থাকে।
গ. সিন্ডিকেটের বাইরে তারা কারও কবি মনে করেন না।এর ফলে, তারা নিজেদের মানুষজনের বাইরে আর অন্য
কারও লেখক মনে করেন না।
ঘ. নিজেদের প্রথাবিরোধি লেখক বলে জাহির করলেও তাদের অধিকাংশ ভয়ংকর মানবতাবিরোধি ও
আত্মকেন্দ্রিক।
এরূপ আর বহু কারণ উপস্থাপন করা যায়। যা হোক, কবি আল মাহমুদ কতটা অসৎ ও ডিগবাজি দক্ষ মানুষ তা অব্শ্যই বিবেচনার বিষয় হল্যও তার কবিতাকে এর সাথে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। যে কোন মানুষ তার নিজস্ব মত থাকতে পারে, তা তার একান্ত বিষয়। তা যদি মানবতারবরোধি না হয়। কবিকে তার কবিতা দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বুদ্ধদেব বসু কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা রাখেন নি বলে কি তিনি কবি নন?
জীবনানন্দ দাশকে কতটা দুঃসহ অমানসিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তার যাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে তা কেবল তিনি নিজে জানেন; অন্যরা অনুমান করতে পারে।
মানুষ আল মাহমুদের প্রতি আমার কোন অাগ্রহ নেই। তবে, তার কবিতা, বিশেষ করে সোনালী কাবিন নিয়ে কিছুটা বিবেচনাও অবশ্য রয়েছে। তার সময়ের যে কোন কবি এর সমান্তরালে দাঁড়াতে পারেন, তা বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
এটা সত্য মানুষ আল মাহমুদ যদি শুধু কবিতার দিকে নজর দিতে, তাহলে বাঙলা কবিতা আরও নতুন কাজ তার থেকে পেত। কিন্তু তা থেকে তিনি তার পাঠককে বঞ্চিত রেখেছেন। দারিদ্র্যের ওজর তোলে নিজের দিকে সহানুভূতি নিতে চাইলেও তা কোন মতে গ্রহনযোগ্য নয়।
অাল মাহমুদের সোনালী কাবিন বাঙলা কবিতায় একটি নতুন সংযোজন। তবে এক্ষেত্রে কবি আহসান হাবীবকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এর কারণ, এর আন্তঃসুর অহসান হাবীবের কবিতায় উপ্ত, তা কোন মতে দূরে সরিয়ে রখো যাবে না। তবে আল মাহমুদ সেই আন্তঃসম্পর্ক ছাপিয়ে গ্রামিণ আহমজের সাথে নগরযাপনের একটি সেতুবন্ধন রচনা করেছেন, তা ফাইলের নিচে ছাপা দিয়ে রাখা যাবে না। একটা নিজস্ব ঢঙ ও সুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার সোনলী কাবিনের বিশেষ করে এর নাম কবিতাগুলোতে তার কোনভাবে মিয়্রমাণ, অনুজ্জ্বল নয়; হিরণ্ময়, শণাক্তযোগ্য। এক্ষেত্রে, কবি ও প্রাবন্ধিক আবিদ আনোয়ারের প্রবন্ধগুলো দেখা যেতে পারে। সঙ্গে সৈয়দ আলী আহসানের লেখাও।
তাই বলা যায়, আল মাহমুদ বাঙলা কবিতায় যে ঘরোয়া কিন্তু চিরকালিন যাপন প্রক্রিয়ার বিবেচনাগুলো তুলে এনেছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
বুদ্ধদেব বসু কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা তাঁর কবিতা সংকলনে রাখল কি রাখল তা কোনভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ নয়, বরং তা বুদ্ধদেব বসুর সীমাবদ্ধতা; একই সঙ্গে জসীম উদদীনের কবিতা রেখেও রাখলেন না, তা কোন গ্রাহ্যতার বিষয় নয়; কেন তিনি রাখলেন না, এর পরিপ্রেক্ষিতগুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
(চলবে, ড্রাফট)
বুদ্ধদেব বসু কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা তাঁর কবিতা সংকলনে রাখল কি রাখল তা কোনভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ নয়, বরং তা বুদ্ধদেব বসুর সীমাবদ্ধতা; একই সঙ্গে জসীম উদদীনের কবিতা রেখেও রাখলেন না, তা কোন গ্রাহ্যতার বিষয় নয়; কেন তিনি রাখলেন না, এর পরিপ্রেক্ষিতগুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
(চলবে, ড্রাফট)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন