যাপনের ছাপচিত্র রাশেদ রহমানের ছোটগল্প
হামিদ রায়হান
সমকালিন সাহিত্যে বিশেষ করে
ছোটগল্পে নিরলসভাবে পরিশ্রমের সঙ্গে যারা কাজ করছেন, লিখছেন নানামুখী বিচিত্র স্বাদ
ও অভিঞ্জতার অনির্ণেয় অন্ধগলিরে চেনা কিন্তু অচেনা ভুবনের গল্প, আর সেই গল্পের সঙ্গে
পাঠকদের মধ্যে একটি মেলবন্ধ তৈরি করছেন, তৈরি করছেন চারপাশের মানুষ ও তার যাপনের বর্ণিল
জগত, এবং সেই হিরণ্ময় যাপনের একটি পরিশ্রমি গল্পকার রাশেদ রহমান।
রাশেদ রহমান কী এমন জগত নির্মাণ করেন, কী কথকতার
সঙ্গে পাঠককে একীভূত করে নেন, যেখানে বিচ্ছুরিত হয়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে এক অ-বলা কথকতা,
যা তার পাঠককে শিহরিত করে, মোহিত করে, দৃষ্টি আকৃষ্ট করে রাখেন তাকে কেন্দ্র করে যে
চারপাশ ও জগত, এবং এর কারুকাজহীন ব্যঞ্জনাহীন জগতের অনন্ত প্রবহমাণতা।
এ অবধি রাশেদ রহমানের যে
ক’টি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে ‘আগুনঘেরা নদী’ (১৯৯৭), ‘সুন্দর পাপ ও বিলাসভূমি’(২০০০),
‘একদিন শুকনো নদীতে’(২০০৩), ‘অন্ধকারে বৃষ্টিতে গান’(২০০৫), ‘ঈশ্বরের চোখে জল’(২০০৭),
‘জাদুর আয়না’(২০০৯), ‘দেশে আর্মি নামলে যে গল্পের জন্ম হয়’(২০১১) ও ‘তৌরাতের সাপ’(২০১২)।
এ আটটি বইয়ের মধ্যে দিয়ে রাশেদ যে মোহময় কিন্তু আশা
ও নিরাশার জগতকে তুলে ধরেন, তা নিঃসন্দেহে একদিকে যেমন যাপনের যে ধারাবাহিক উদযাপনের
সমস্ত প্রক্রিয়ার ক্লেদময় বিশ্রি ও নোংরা জগতের প্রবাহকে উচিয়ে তুলে ধরেন, অন্যদিকে
আনন্দ ও এর বিপরীতে মানুষের অদম্যতার গল্পকে উন্মোচিত করেন তা কোনভাবে হালকাচোখে দেখার
কোন সুযোগ পাঠককে রাশেদ রহমান দেন না, বরং এর নিরন্তন অন্তঃস্রোতের সঙ্গে আত্মীকৃত
করে নেয়। আর এখানেই গল্পকার রাশেদ রহমানের কৃতিত্ব ও সফলতা।
আমরা
যারা নব্বইয়ের শুরুতে ও মধ্য থেকে কবিতার সমান্তরালে অল্পপ্রজের মতো ছোটগল্প লিখতে
শুরু করি, তাদের সামনের যাপনের অনন্ত প্রবহমাণতার আন্তঃসম্পর্কায়নের প্রক্রিয়াকে গল্পে
বাস্তবায়নের প্রয়াস করি, এর সংখ্যা নখদন্তে গুণে বলা যায়।
তবে
এটা সত্য যে, যে সব নব্বইকে কেন্দ্র করে যেসব সংখ্যা বেরয়, এর অধিকাংশ সংখ্যা অন্ধকারেই
মুখ তুথড়ে পড়ে আছে। সেই সব সংখ্যা কতটা মানসম্মত, সেটা পাঠকরাই ভাল বলতে পারবেন। উল্লেখ্য,
রাশেদ রহমানের প্রথম গল্প বেরয় টাঙ্গাইল থেকে ১৯৮৯ সালে লিটলম্যাগ ‘বিজয়’ এর ১ম সংখ্যায়।
আর
এ প্রয়াসের সঙ্গে রাশেদ রহমানের ছোটগল্পকে কোন অর্থে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। এর কারণ,
যে ছোটগল্পের ভুবন তিনি নির্মাণ করেন, তা চারপাশের যাপিতজীবনের চেনাজানা জগতকে অসম্ভব
কূশলতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, তা কী তীব্রভাবে টেনে রাখে কাহিনির অন্তিমে, যেখানে
থেকে ঝরে পড়ে পাঠকের স্পর্শের নাগালের অভিঞ্জতার কী অপূর্ব্ হিরে-পান্না, যা একজন লেখকের কাছে পাঠকের আর কী চাওয়ার থাকে।
যে জানাশোনা জগতের কথাগুলো তিনি পাঠকের কাছে আত্মকথানের মিশেলে, সঙ্গে উত্তম পুরুষের ঢঙ, যা তার গল্পকে একদিকে যেমন বিশ্বাসযোগ করে তোলে, অন্যদিকে গল্পের প্রতিটি বর্ণনা পাঠকের সামনে বরফফ্লেকের মতো নামতে থাকে ধীরে আস্তে, যেমন- রাশেদ রহমানে গল্পের বই ‘তৌরাতের পাপ’ এর নাম গল্পটি “অন্ধ রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি”।
যে জানাশোনা জগতের কথাগুলো তিনি পাঠকের কাছে আত্মকথানের মিশেলে, সঙ্গে উত্তম পুরুষের ঢঙ, যা তার গল্পকে একদিকে যেমন বিশ্বাসযোগ করে তোলে, অন্যদিকে গল্পের প্রতিটি বর্ণনা পাঠকের সামনে বরফফ্লেকের মতো নামতে থাকে ধীরে আস্তে, যেমন- রাশেদ রহমানে গল্পের বই ‘তৌরাতের পাপ’ এর নাম গল্পটি “অন্ধ রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি”।
এ
হিরে দ্যুতি চড়িয়ে পড়ুক চারপাশ থেকে দূরে, দূরান্তে তা রাশেদ রহমানের গল্প কী সেই ইঙ্গিত
পাঠকের পাঠের সঙ্গে উপ্ত নয় কি? কী অর্থময়তার সঙ্গে তিনি পাঠককে একটি ক্লেদময় আশা-নিরাশা
ও টানাপোড়েনের পৃথিবীর কথা বলেন, যা সত্যি বিশেষভাবে প্রণিধাণযোগ্য।আর এভাবে তিনি আপমাদের মতো পাঠকদেরকে জাগিয়ে রাখেন, করেন উদ্দীপ্ত ও আশাবাদি এক গল্পকথকের দিকে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন