সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

Destination of Poetry ।। কবিতার ভবিতব্য: একটি সাম্প্রতিক পাঠ

কবিতার ভবিতব্য: একটি সাম্প্রতিক পাঠ
                     হমিদ রায়হান








কবিতা কী এ তর্ক প্রাচিনকাল থেকে প্রচলিত। বিভিন্ন জনে বিভিন্নভাবে একে দেখেছে, তা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। জীবনকে সামগ্রিকভাবে কত জনে বর্ণনা করতে পারে, বলা মুশকিল। এ যেন নানা জনে নানা মতে’র মতো একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা কেবল একজন পাঠক হিসেবে, দর্শক হিসেবে দেখা যায়, উল্টে পৃষ্ঠে এর এপিঠ-ওপিঠ দেখা যায়, এর বাইরে কী কল্পনা যায়, সময়ই একে ব্যাখ্যা করতে পারে।
তবে এটা সত্য যে, কবিতার আদিকাল থেকে এর বিবর্তনের পরিক্রমায় যে বৈশিষ্ট্যগুলো, যে উপাত্তগুলো দেখা যায়, তা কোনভাবে কি দূরে সরিয়ে রাখা যাবে, বলা কঠিন।
জসীমউদ্দীন বাঙলা কবিতায় যে উপরিকাঠামোর মধ্য দিয়ে যে জগতকে পাঠকের সামনে উন্মোচিক করেন, তা শণাক্তযোগ্য, স্মরণীয়। তাঁর কবিতায় যে তখনকার সমাজের, যাপনের টুকরো টুকরো সম্পর্কগুলো উঠে এসেছে, যা একটি ক্ল্যাসিকধর্মি অবয়ব তাঁর কবিতায় রূপ দিয়েছে। আল মাহমুদ নিজস্ব কণ্ঠকে, নিজের অস্তিত্বকে চিহ্ণিত করলেও এর উপাত্ত কি জসীমউদদীনের কবিতায় উপ্ত নয়, তা উচুঁ গলায় কেউ কেউ বললেও, তাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক নয়।
বলা যায়, আল মাহমুদ জসীমউদদীনের একটি ধারাবাহিক সম্প্রসারন। তবে, তাঁর কণ্ঠকে আলাদা করা যায়, “সোনালী কাবিন” এর নামকবিতাগুলো। এ কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে আল মাহমুদ একটি জাতির কণ্ঠস্বরকে শণাক্তকরণে যে প্রয়াস দেখা যায়, তা কোনভাবে আড়াল করার কোনও সুয়োগ নেই। লৌকিক উপাত্তগুলো সাংস্কৃতিক পরিকাঠােোয় যে প্রকাশ, তা যে কোন পাঠককে বিমোহিত করে, টেনে রাখে একটি জাতির মূল প্রবাহের সঙ্গে। এখানে, যে কথাটি না বললে নয়, তা হল, আহসান হাবীবের কবিতায় যে আশাবাদের  দৃপ্ত উচ্চারণ দেখা মেলে, সেখানে কিন্তু  লৌকিক উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্যযোগ্য। আল মাহমুদ যে লৌকিক উপাদানের একীভূত করেনে তা কিন্তু অনেকটা আহসান হাবীবের কবিতার প্রণোদনা, তা কোনভাবে অস্বীকার করা যায় না। এ প্রসঙ্গে কবি ও প্রাবন্ধিক আবিদ আনোয়ারের বক্তব্য বিশেষভাবে বিবেচনা করা যায়।
তাতে কবি আল মাহমুদের অর্জনকে কোনভাবে ছোট করে দেখা শোভন হবে না। তিনি ‘সোনালী কাবিন’ কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে একটি জাতির কণ্ঠস্বরকে যেভাবে উঁচিয়ে ধরেন, তা অস্তিত্বের কোষে কোষে অনুরণন সৃষ্টি করে, নির্মাণ করে শৈল্পিকভুবন, যা একান্ত নিজস্ব। তবে এর পরিপ্রেক্ষিতো একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নির্মিত।
আল মাহমুদ এ জগত নির্মাণ করার যে প্রয়াস করেন, এর নমান্তরালে জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের কথা যদি বিবেচনায় আনা যায়, তাহলে একটি সীমারেখা তৈরি করতে কোন ত্বিধায় কিংবা কোনরকম দোটানায় পড়ার কোন অবকাশ থাকবে না।
জীবনানন্দ দাশ ও আল মাহমুদ- এ দু’জনের  কবিতাগুলো একত্রে কিংবা পাশাপাশি রাখা যায়, তাহলে এ দু’জনের মধ্যেকারে ফারাক ও বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যবধানগুলো একটি বিন্দুতে রাখা যাবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে, জসীম উদদীনের কথা বিবেচনায় রাখা জরুরি। এ কারণে জরুরি যে, জসীম উদদীনের কবিতার প্রেক্ষাপট ও উপাত্তগুলো যদি দু’কবির কবিতাগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে পড়া যায়, তাহলে একটি সিদ্ধান্ধে যাওয়া কোন কঠিন কাজ হবে মনে হয় না।
যাই হোক,জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কবিতার কথা’য় কবিতা সম্পর্কিত অনেক মূল্যবান কথা বলে গেছেন, তন্মধ্যে কেবল সবাই কবিত নয়, কেউ কেউ কবি। বহুল পঠিত, বিজ্ঞাপিত কথা, যা কবিতা নিয়ে যাদের কিছুটা রক্ত-ঘাম মাথা ঝরে, তাদের কারও কারও হয়ত এ কথাটি নখদন্তে আছে।

তুমি-আমি পর্ব এখনও শেষ হয় নি, ওয়েব শিল্পের কারণে যথেচ্ছভাবে এর সুতো আগলা যাচ্ছে, একেবারে হাতের মুঠোয় এর উৎকর্ষ লাভ করছে, যা সত্যি উল্লেখযোগ্য। এর ফলে, যা লাভ-ক্ষতি হোক না-কেন, সবচেয়ে লাভ হল, এককেন্দ্রিক আধিপত্য থেকে মানুষের লাভ হল। নিজেদের মত করে নিজেরা আপন আপন প্রাসাদ-সৌধ নির্মাণ করতে পারছে। কিন্তু সেটা কতটা শৈল্পিক মহিমা পেল, কিংবা এর ভিত্তিমূল কতটা শক্ত পাঠাতনের উপর দাঁড়াল, তা চোখের অগোছরে থেকে যাচ্ছে। অর্থা্ৎ উপরিকাঠামোর দিকে দৃষ্টি থাকার কারণে এর ভেতরের বিষয়াবলির দিকে নজর কম হওয়ার কারণে তা চিরকালিন হয়ে উঠতে পারছে না। বলা যায়, সমকালিন অধিকাংশ সংকলন, সমালোচনা কিংবা সৃজনশীল কর্ম বলে যা স্বীকৃতি পাচ্ছে, তা সেই ধাচে নির্মিত।
’৭১ থেকে আজ অবধি যে সব কাজ বা সৃজনশীল নির্মিতি মুদ্রিতভাবে পাঠকের সামনে যা উপস্থাপিত, তা কতটা শিল্পমূল্যে বিকশিত, সমৃদ্ধ।
এ নিয়ে এখনই ভাবা যায়, লাভ-ক্ষতি কিংবা কতটা উৎকর্ষের দিকে কবিতা গেল, তা তলিয়ে দেখলে খুব একটা গা শিউরে উঠতে হবে, তা নয়; বরং সামনের দিকে পথগুলো সহজ, মৃসণ হবে তা বলা যায়।
বাজারে প্রচলিত, সত্তরের কবি ও কবিতা যতটা দৃঢতার উপর দাঁড়িয়ে আছে, এ দশকের কবিরা এখনও সক্রিয়, এ দশকের কবিতার কাছে প্রায় পুরোপুরিভাবে আশির কবিতা মিয়্রমাণ, নিষ্প্রভ। স্ফূটিকের বিচ্ছুরণের মতো আশির কয়েক জন কবির কবিতায়  তা লক্ষ্য করা যায়, তবে কতটা সমুজ্জ্বল, বীর্ষমান তা আলোচনাসাপেক্ষ। এ যেন প্রদীপের নিচে সলতে যেরকম, ঠিক সত্তরের কবিতার কাছে আশির কবিতা ঠিক তাই।
এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বায়বিয়ভাবে প্রকাশিত, যদি তাই হয়, তবে সত্তরের কবিতা কি খুব একটা বেশি দূর এগিয়েছে?
কথাটা মন্দ না।
আরো যুক্ত হয়, আবুল হাসান, সিকদার আমিনুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আজীজুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, মোহাম্মদ রফিক, মুহম্মদ নূরুল হুদাসহ আরো বহু কবির কবিতা বলা যায়। তাঁদের কবিতার কাছে সত্তরের কবিতা কতটা দাঁড়ায়, সেই প্রসঙ্গটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। এর ফলে, এ দু’দশকের কবিতা মধ্যে একটি সীমারেখা  কিংবা একটি উপলব্ধিতে গিয়ে পৌঁছা যাবে। তাই নয় কি?
 একটি বিষয় যদি এ ক্ষেত্রে সমান্তরালে চেখে দেখা যায়, তা হল, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ কিংবা হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতার সঙ্গে সিকদার আমিনুল হক কিংবা নির্মলেন্দু গুণের কবিতাকে মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে একটি পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করা যায়। তবে, সাইয়িদ আতীকুল্লা’র কবিতার সঙ্গে  সৈয়দ, আজীজুল হক কিংবা আবদুল মান্নান সৈয়দ এর কবিতার মধ্যে এক ধরণের আন্তঃযোগাযোগ  উপ্ত, যা পাঠকমাত্র লক্ষ্য করে থাকবেন।
[চলবে]


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দেখুন

 দেখুন উৎসর্গ: নান্টু রায়, প্রিয় মানুষ ও সম্পাদক একজন রমণি জ্বলছে  কেরসিনে তার থেকে আর একজন রমণি জ্বলছে। আগুণ বাড়ছে। রমণি বাড়ছে। আগুন বেড়ে যাচ্ছে।

POETS get IMPATIENT

There’s no rain seen showering upon the male, female, baby or the world. Now, every one dreams to have showered in their own style, and it only happens in the realm of unconsciousness Freud, one of the great master of thinking affecting most of the thinkers of the twenty century, even today’s young thinkers or artists who’s a little lust for knowledge. Every where water dies away and murmurings groan arises from each and every heart. Who’ll come to soften their heart and mind? Man dies. Woman dies, Baby dies. Future dies.   Fire sowed in them goggles the way, but there’s nothing they find but hope. Shahid Kadri , poet of 50s in Bangladesh , pictures the images of the distorted people through passion and love. Shamsur Rahman , another power poet of 50s drew the appearances of time in a way the inpseudo reality remained around him in which dreams for people were presented very artisticly. Muzibul Hoque Kabir , poet of 70s, drives his readers to crying phenomena where hopes an...

Rashed Rahman & His Short Story ।।রাশেদ রহমানের ছোটগল্প

যাপনের ছাপচিত্র রাশেদ রহমানের ছোটগল্প                 হামিদ রায়হান সমকালিন সাহিত্যে বিশেষ করে ছোটগল্পে নিরলসভাবে পরিশ্রমের সঙ্গে যারা কাজ করছেন, লিখছেন নানামুখী বিচিত্র স্বাদ ও অভিঞ্জতার অনির্ণেয় অন্ধগলিরে চেনা কিন্তু অচেনা ভুবনের গল্প, আর সেই গল্পের সঙ্গে পাঠকদের মধ্যে একটি মেলবন্ধ তৈরি করছেন, তৈরি করছেন চারপাশের মানুষ ও তার যাপনের বর্ণিল জগত, এবং সেই হিরণ্ময় যাপনের একটি পরিশ্রমি গল্পকার রাশেদ রহমান।   রাশেদ রহমান কী এমন জগত নির্মাণ করেন, কী কথকতার সঙ্গে পাঠককে একীভূত করে নেন, যেখানে বিচ্ছুরিত হয়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে এক অ-বলা কথকতা, যা তার পাঠককে শিহরিত করে, মোহিত করে, দৃষ্টি আকৃষ্ট করে রাখেন তাকে কেন্দ্র করে যে চারপাশ ও জগত, এবং এর কারুকাজহীন ব্যঞ্জনাহীন জগতের অনন্ত প্রবহমাণতা। এ অবধি রাশেদ রহমানের যে ক’টি ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয়, তন্মধ্যে ‘আগুনঘেরা নদী’ (১৯৯৭), ‘সুন্দর পাপ ও বিলাসভূমি’(২০০০), ‘একদিন শুকনো নদীতে’(২০০৩), ‘অন্ধকারে বৃষ্টিতে গান’(২০০৫), ‘ঈশ্বরের চোখে জল’(২০০৭), ‘জাদুর আয়না’(২০০৯), ‘দ...